

রেজাউল করিম, ফরিদপুর
পদ্মা সেতু ও ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা। প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহনের যাতায়াতে ব্যস্ত এই জনপদে এখন সড়ক নিরাপত্তা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম আতঙ্ক।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট—মাত্র আট মাসে ভাঙ্গা উপজেলায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫২ জন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৩০ জন। নিহতদের মধ্যে তরুণ ও মোটরসাইকেল আরোহীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সর্বশেষ এক সপ্তাহেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৮ যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আর শুধু আগস্ট মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১১ জনের। এর আগে জুলাইয়ে ৬, জুনে ৮ এবং মে মাসে ৯ জন নিহত হন। অর্থাৎ মে থেকে আগস্ট—টানা চার মাসে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩ জন।
মাসে মাসে বাড়ছে প্রাণহানি
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৩, মার্চে ৬ এবং এপ্রিলে ৮ জনের মৃত্যু হয়। মে মাসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ জনে। জুনে ৮, জুলাইয়ে ৬ এবং আগস্টে সর্বোচ্চ ১১ জন নিহত হন।
এ হিসাবে বছরের প্রথম আট মাসে মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে। একই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
অতিরিক্ত গতি ও যানবাহনের চাপ বড় কারণ
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাঙ্গায় দুর্ঘটনার পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি, মহাসড়কে যানবাহনের চাপ, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলারের চলাচল এবং মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী ট্রাকের বেপরোয়া গতি।
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা। ফলে ভাঙ্গা এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেলেও সেই অনুপাতে সব সড়ক অবকাঠামো এখনও নিরাপদ ও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক, সেতু ও কালভার্টের সংকীর্ণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চারটি সেতুতে বাড়তি ঝুঁকি
ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কের কয়েকটি অংশ এখনও দুই লেনের সরু সেতুর ওপর নির্ভরশীল। এসব স্থানে বিপরীতমুখী যানবাহন চলাচলের সময় তৈরি হয় অতিরিক্ত ঝুঁকি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাবনতলা, সরু ও চাপা সেতু এলাকার মতো কয়েকটি স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। দ্রুতগতির যানবাহন যখন এসব সংকীর্ণ স্থানে প্রবেশ করে, তখন সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা কম
মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানের চলাচল নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অনেক চালক নির্ধারিত নিয়ম না মেনে মহাসড়কে চলাচল করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি।
ফলে প্রতিদিনের যাতায়াত অনেক পরিবারের কাছে পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তার যাত্রায়। একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে না, একই সঙ্গে একটি পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছে আর্থিক ও সামাজিক সংকটের দিকে।
পুলিশের ভাষ্য
ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) রেজওয়ান দীপু বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে ভাঙ্গার ওপর দিয়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। ফলে সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে এবং এ কারণে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।
অবকাঠামো উন্নয়ন ও কঠোর নজরদারির দাবি
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভাঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও সড়কগুলো আরও প্রশস্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে সংকীর্ণ সেতু ও কালভার্টগুলো দ্রুত প্রশস্ত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে চলবে না; দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। চালকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান, কার্যকর নজরদারি এবং সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানির এই ভয়াবহ চিত্র অনেকটাই বদলানো সম্ভব।
ভাঙ্গার সড়কে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচল। তাদের নিরাপদ যাতায়াত এখন আর কেবল দাবি নয়—এটি হয়ে উঠেছে জীবন রক্ষার জরুরি প্রশ্ন।
মন্তব্য করুন