মুফতী শাহীর উদ্দীন নাহিদ
লেখক ও দাঈ।
প্রিন্সিপাল: আজলবেড়া ইসলামিয়া ফয়জেআম মাদরাসা ও এতিমখানা--
ইসলামে যে বিধানগুলোর উপর সমাজের স্থায়িত্ব, শান্তি ও সুখ-সমৃদ্ধি নির্ভর করে, তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কাজ হলো ‘আম্র বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকার’। এটি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় নয়, এটি একটি জাতিকে জীবিত রাখা ও সমাজের নৈতিক মানদণ্ড রক্ষা করার প্রধান হাতিয়ার।
*১.উম্মতে মুহাম্মাদীর সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মূল ভিত্তি*
প্রিয় পাঠক, আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে অন্যান্য সমস্ত উম্মতের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো বংশগত বা ভৌগোলিক কারণে নয়, বরং একটি বিশেষ দায়িত্বের কারণে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে।”
(সূরা আল-ইমরান: ১১০)
এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, মুমিনের মূল কাজই হলো সমাজের মানুষের উপকার করা, তাদের আলোর পথ দেখানো এবং পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা।
*২.মুমিনদের পারস্পরিক বন্ধন ও সামাজিক দায়িত্ব*।
আজকে সমাজে আমরা দেখতে পাই একে অপরের ব্যাপারে চরম উদাসীনতা। কিন্তু ইসলাম মুমিনদের এক সুদৃঢ় সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সূরা তওবায় বলেন:
“আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় ও অসৎকাজে নিষেধ করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদের ওপরই আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন।”
(সূরা অত-তওবা: ৭১)
অর্থাৎ, সত্যিকার মুমিন কখনো সমাজে অন্যায় হতে দেখে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। ভাই বিপদে পড়লে যেমন আমরা ছুটে যাই, তেমনি কোনো ভাই বা সমাজ পাপে লিপ্ত হলে তাকে বাঁচানো আমাদের ঈমানী দায়িত্ব।
*৩.অন্যায় প্রতিরোধের তিন স্তর ও ঈমানী দায়িত্ব*
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যায় ও সামাজিক ব্যাধি দূর করার জন্য একটি বৈপ্লবিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় বা পাপ কাজ হতে দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত (শক্তি বা ক্ষমতা) দিয়ে প্রতিরোধ করে। তা সম্ভব না হলে মুখ দিয়ে (নসিহত ও আলোচনার মাধ্যমে) তা সংশোধন করে দেয়। আর যদি তাও সম্ভব না হয়, তবে অন্তর দিয়ে তা ঘৃণা করে (এবং তা দূর করার পরিকল্পনা করে)। আর এটিই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।”
(সহীহ মুসলিম: ৭৮)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল। শাসক বা প্রশাসনের দায়িত্ব হাত দিয়ে (আইন দিয়ে) আটকানো, আলেম ও সচেতন সমাজের কাজ মুখ দিয়ে/লেখার মাধ্যমে বোঝানো, আর সাধারণ মানুষের দায়িত্ব তা মনে-প্রাণে ঘৃণা করা ও এড়িয়ে চলা।
*৪.অন্যায় দেখে চুপ থাকার ভয়াবহ পরিণতি*
প্রিয় পাঠক! আজ আমাদের সমাজে এত অশান্তি, হাহাকার এবং আল্লাহর গজব নেমে আসার মূল কারণ হলো আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ ছেড়ে দিয়েছি। আমরা ভাবি—"অমুক পাপ করছে, এতে আমার কী?" কিন্তু রাসুল (সা.) আমাদের সতর্ক করে গেছেন।
*১.দোয়া কবুল না হওয়া:*
হযরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সা.) শপথ করে বলেন:
“যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি! তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে। তা না হলে শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর শাস্তি নাজিল করবেন। এরপর তোমরা তাঁকে ডাকবে (দোয়া করবে), কিন্তু তিনি তোমাদের দোয়ায় সাড়াও দেবেন না।”
(জামে তিরমিযী: ২১৬৯)
২.নৌকার আরোহীদের প্রসিদ্ধ দৃষ্টান্ত:
হাদিস শরীফে আল্লাহর নবী (সা.) একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন। একদল লোক দোতলা নৌকায় উঠল। নিচের তলার লোক পানির জন্য কাঠের মেঝেকে ফুটো করতে চাইল। এখন ওপর তলার লোকেরা যদি তাদের বাধা না দেয়, তবে শুধু নিচের তলাই ডুববে না, পুরো নৌকার সবাই একসাথে সলিল সমাধি লাভ করবে! (সহীহ বুখারী: ২৪৯৩)
আজ আমাদের সমাজও সেই নৌকার মতো। সমাজ বিনষ্ট হলে তার পরিণতি ভালো-মন্দ সবাইকে ভোগ করতে হবে।
৫.দাওয়াত ও সংশোধনের নবীজী প্রদর্শিত পদ্ধতি
আমরা যখন সৎকাজের আদেশ বা অসৎকাজে নিষেধ করতে যাব, তখন আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে:
প্রজ্ঞা ও নরম ভাষা: কঠোরতা দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তুমি তোমার রবের পথে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করো।” (সূরা আন-নহল: ১২৫)
গোপনীয়তা রক্ষা: কারও দোষ সবার সামনে প্রকাশ করে তাকে লজ্জিত করা যাবে না, বরং গোপনে ডেকে নসিহত করতে হবে।
নিজের আমল ঠিক রাখা: অন্যকে ভালো উপদেশ দেওয়ার আগে নিজেকে তা পালন করতে হবে, নতুবা এই কথার কোনো আসর থাকবে না।
উপসংহার ও আহ্বান
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কোনো নির্দিষ্ট আলেম বা দলের একক দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পরিবারে এবং সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে। আজ যদি আমরা নিজ নিজ সন্তান, পরিবার ও প্রতিবেশীকে ভালো কাজের তাগিদ দিই এবং অন্যায় থেকে দূরে রাখি, তবেই একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় সমাজ গঠন করা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সাথে এই মহান দায়িত্ব পালন করার তৌফিক দান করুন। আমিন