রেজাউল করিম, ফরিদপুর:
ফরিদপুরে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে মনোজিত সরকার (৪৩) নামে এক ব্যক্তিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, আদায়কৃত জরিমানার সম্পূর্ণ অর্থ যেন নিহতের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে ফরিদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) শামীমা পারভীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় প্রধান আসামি মনোজিত সরকার আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, একই মামলায় অভিযুক্ত মনোজিত সরকারের আরও ছয় স্বজন—বিপুল সরকার, সরজিৎ সরকার, লিটন সরকার, বিপ্লব সরকার, সবুজ সরকার ও দীপালী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত তাদের বেকসুর খালাস প্রদান করেন।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার জারজননগর গ্রামের রঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে রমা বিশ্বাসের সঙ্গে একই উপজেলার কলাইকান্দা গ্রামের মনোজিত সরকারের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় কনের পরিবার যৌতুক হিসেবে নগদ ৪ লাখ টাকা, সাড়ে তিন ভরি স্বর্ণালঙ্কার এবং প্রায় ৫০ হাজার টাকার আসবাবপত্র প্রদান করে। পরবর্তীতে আরও এক লাখ টাকা দেওয়া হলেও মনোজিত সরকার পুনরায় অতিরিক্ত এক লাখ টাকা দাবি করেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল দাবিকৃত টাকা না পেয়ে মনোজিত সরকার তার স্ত্রী রমা বিশ্বাসকে নাইলনের সুতা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হয়। সে সময় মধুখালী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয় এবং নিহতের পরিবারকে জানানো হয়, পেটের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে রমা আত্মহত্যা করেছেন।
তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, রমা বিশ্বাসের মৃত্যু শ্বাসরোধে হত্যার ফলে হয়েছে। এরপর ২০১৮ সালের ১০ মে নিহতের বাবা রঞ্জন বিশ্বাস মধুখালী থানায় মনোজিত সরকারসহ সাতজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মনোজিত সরকারকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় দেন। একই সঙ্গে অপর ছয় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম রব্বানী ভূঁইয়া বলেন, যৌতুককে কেন্দ্র করে নারীর প্রতি সহিংসতা সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। আদালতের এ রায় শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেনি, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।